জীবনানন্দের কবিতাংশ হয়ে সাকিব-মুশফিকের মাঠের লড়াই জমুক

জীবনানন্দ দাশ তার ‘কুড়ি বছর পরে’ কবিতায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন প্রিয়তমার সাথে আবার যদি হঠাত দেখা হয়ে যায়। তবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনী-মোহামেডানের পুরোনো সেই উত্তাপ, রোমাঞ্চ কিংবা আবেগে ছুঁয়ে যাওয়া হয়তো পরবর্তী কুড়ি বছরেও আসবেনা। কোটি ভক্তের হৃদয়ে আকাশী-নীলে একাকার আবাহনী কিংবা সাদা-কালোয় মোড়ানো এক টুকরো আবেগের নাম ছিল মোহামেডান।

বর্তমান সময়ে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ বলতে কাগজে-কলমের দুটি শব্দেই আটকে থাকে। একটা সময় যা সমর্থকদের রক্তে আগুন লাগিয়ে দেওয়া কিংবা মগজে-মননে দৃঢ়ভাবে গেঁথে যাওয়া কোনো বিষয়বস্তু ছিল।

ঢাকার রাস্তায় ঘোড়ার গাড়িতে করে দল দুটিকে সমর্থন দিতে নেমে পড়তো পাগলা ভক্তরা। আশি, নব্বই কিংবা একুশ শতকের প্রথম কয়েক বছরেও ঢাকার ক্লাব ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা হকি, টেনিসে আবাহনী-মোহামেডানের জৌলুশ আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নাকি ঐতিহ্য ধারণ করে থাকে অথচ এই সোনালী অতীত এখনকার তরুণদের কাছে কতটা জানা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবাহনীর কোন ক্রিকেটার মোহামেডানে নাম লেখালে কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হত। কারণ প্রিয় খেলোয়াড় ক্লাব ছাড়াটাকে সংশ্লিষ্ট ক্লাবের সমর্থকরা হৃদয় ভাঙার অনুভূতিতে পরিণত করতো। প্রিয় তারকার বিচ্ছেদ আটকাতে দলবদলের সময় ক্লাবে বন্দী করে রাখার নজিরও ছিল।

সময়ের বিবর্তনে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনী-মোহামেডান তো বটেই ক্লাবগুলোই হারিয়েছে আবেদন। ক্লাব ফুটবল, ক্রিকেটে স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হওয়ার ইতিহাস এখন আর্কাইভে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রিয় দলের হার মেনে নিতে না পেরে দলের খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের উপর চড়াও হতেও দ্বিধা করতো না তখনকার উন্মাদনায় নিজেদের একাকার করে ফেলা ভক্ত-সমর্থকরা।

দেশের ক্রিকেট বিশ্ব মঞ্চে দাপট দেখানো শুরু করতেই ফুটবল পড়ে গেছে পেছনে। জাতীয় দলের বাইরে ক্লাব ক্রিকেটেও এখন আর আগ্রহ নেই, উত্তেজনা নেই। এত এত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশ যে ক্লাব ক্রিকেটে আলাদা করে তারকাদের খেলা দেখার রোমাঞ্চ অনুভব করেনা ভক্ত-সমর্থকরা।

তবে এরপরেও প্রতিবছর ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা হকিতে মুখোমুখি আবাহনী-মোহামেডান। কিন্তু নেই সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুগের পর যুগ এই দুই ক্লাব শাসন করেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। যেকোনো টুর্নামেন্টে ছিল সমানে সমান, শিরোপা জয়ের দিক থেকেও কেউ কাউকে কম টক্কর দিতনা। বেশিরভাগ ফাইনালেই মুখোমুখি হত এই আকাশী-নীল ও সাদা-কালো শিবির।

৯০ এর দশকে জনপ্রিয় গান ‘তোমার আমার ব্যবধান, আবাহনী-মোহামেডান’ এখন স্মৃতি হয়ে কারও কারও কানে বাজে ঠিকই। তবে ঐতিহ্য থাকলেও উত্তেজনা হারানো আবাহনী-মোহামেডানের সাফল্য-ব্যর্থতার ব্যবধানও বেড়েছে। সর্বশেষ এক যুগের হিসেব কষলেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকছে আবাহনী।

আরও সীমিত মানদন্ড নির্ধারণ করলে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল) লিস্ট ‘এ’ মর্যাদা পাওয়ার পর আবাহনীর তিন শিরোপার বিপরীতে মোহামেডানের নেই একটিও। মুখোমুখি লড়াইয়েও বেশ পিছিয়ে সাদা-কালোরা, সর্বশেষ ২০ বারের দেখায় ১৫ বারই বিজয় কেতান উড়িয়েছে আবাহনী। মোহামেডান সর্বশেষ শিরোপা ঘরে তোলে ২০০৮-২০০৯ মৌসুমে।

তবে সব ছাপিয়ে এবার শিরোপার লড়াইয়ে নামার মত দলই গড়েছিল মোহামেডান। ২০১৯-২০২০ মৌসুমের স্থগিত হওয়া ডিপিএল এবার মাঠে গড়ালো টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। গতবছর নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো দলেই নাম লেখাতে না পারা সাকিব আল হাসান এবার যোগ দিয়েছেন সাদা-কালো শিবিরে। দলটির অধিনায়কত্বও দেশের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা তারকার কাঁধে।

চলতি মৌসুমেও জাতীয় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটার নিয়ে গড়া আবাহনী ইতোমধ্যে ৬ ম্যাচের ৫ টিতে জিতে আছে টেবিলের শীর্ষে। মোহামেডানের শুরুটাও হয়েছে দুর্দান্ত, টানা তিন ম্যাচে পেয়েছিল জয়, তবে দেখেছে মুদ্রার অন্য পিঠও। চির প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর বিপক্ষে মিরপুরে শুক্রবার (লিগের ৭ম রাউন্ডে) দুপুর দেড়টায় মাঠে নামার আগে তাদের সঙ্গী টানা তিন হার।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার আবাহনী অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম যেখানে ব্যাট হাতে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেখানে সাকিব যেন বিবর্ণ। ব্যাট হাতে দুই শূন্য সহ ৬ ইনিংসে রান সাকূল্যে ৭৬! বল হাতে অবশ্য নিজের নামের প্রতি কিছুটা হলেও করেছেন সুবিচার, উইকেট নিয়েছেন ৭ টি।
দেশের ক্রিকেটে রটে যাওয়া সাকিব ঘরোয়া ক্রিকেটের মশলা না ব্যাপারটাই হয়তো আরেক দফা নতুন করে ঘটছে। সত্যিকার অর্থেই ক্লাব ক্রিকেটে সাকিবের নেই অবিস্মরণীয় কোনো ইনিংস কিংবা বোলিং ফিগার।

তবে সব কিছু পেছনে ফেলে এবারের লিগে এখনো পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা আবাহনীর সাথে ৬ নম্বরে থাকা মোহামেডান কতটা লড়াই করতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। সাকিব বড় ম্যাচ, বড় মঞ্চের ক্রিকেটার বলে বাতাশে ভেসে বেড়ানো কথন কতটা সত্য প্রমাণিত হয় সেটি দেখার জন্যও মুখিয়ে থাকবে অনেকে।

প্রতিপক্ষে মুশফিকের সাথে মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, আফিফ হোসেন, লিটন দাস, নাইম শেখ, নাজমুল হোসেন শান্ত, তানজিদ হাসান সাকিব, মেহেদী হাসান রানাদের বিপক্ষে বেশ দুর্দান্তই খেলতে হবে সাকিবের মোহামেডানকে।

তবে বৃহস্পতিবার (৬ষ্ঠ রাউন্ডে) লেজেন্ডস অব রুপগঞ্জের সাথে যেভাবে হেরেছে শামসুর রহমান শুভ, পারভেজ হোসেন ইমন, ইরফান শুক্কুর, আবু জায়েদ রাহি, আবু হায়দার রনিদের নিয়ে গড়া মোহামেডান তাতে ফেভারিট আবাহনীর সম্ভাবনা যেন আরও বেড়ে গেল।

পুরোনো উত্তাপ, উত্তেজনা হয়তো দেখা যাবেনা তবে ম্যাচে দুই দলের পাশাপাশি কাভার করা সাংবাদিক, সাপোর্ট স্টাফ সহ পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে থাকা বেশ কিছু ভক্তের জন্য আজকের ম্যাচটি দারুণ উপলক্ষ্য। সব ছাপিয়ে জয় হোক আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথের, মাঠের ২২ গজ, সবুজ গালিজা ছাড়িয়ে উন্মাদনার রঙ লাগুক আকাশী-নীল, সাদা-কালো শিবিরে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *